Likebd.com

মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি; গণহত্যার নির্মম নিদর্শন

বিডিলাইভ ডেস্ক: ১৯৭১ সালে মিরপুরের অনেকগুলো জায়গা হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। সেখানে ছিল ওয়াসার একটি পাম্প হাউস। নির্বিচারে হত্যা করে এ পাম্প হাউসের নিকষ কালো কূপে ফেলে দেওয়া হয় কত শত মানুষের মরদেহ। পাকিস্তানি হানাদারদের ধারণা ছিল, এ অন্ধকার কূপের আড়ালেই ঢেকে যাবে তাদের কুকীর্তি। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পর এখানে খননকাজ চালিয়ে দেখা পাওয়া […]

লাইকবিডি ডেস্ক: ১৯৭১ সালে মিরপুরের অনেকগুলো জায়গা হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। সেখানে ছিল ওয়াসার একটি পাম্প হাউস। নির্বিচারে হত্যা করে এ পাম্প হাউসের নিকষ কালো কূপে ফেলে দেওয়া হয় কত শত মানুষের মরদেহ। পাকিস্তানি হানাদারদের ধারণা ছিল, এ অন্ধকার কূপের আড়ালেই ঢেকে যাবে তাদের কুকীর্তি। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পর এখানে খননকাজ চালিয়ে দেখা পাওয়া যায় দেশের অন্যতম বৃহৎ এক বধ্যভূমির। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে যা এখন ‘মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি’ নামে পরিচিত। সেখানে তৈরি বিভিন্ন স্থাপনার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম জানছে একাত্তরের গণহত্যার নির্মমতা। এখানকার ছোট্ট সংগ্রহশালা থেকে জানা যায় সে সময়ের বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা।

এর দুটিতে ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর খননকাজ চালায়। স্থানীয়ভাবে এই জায়গা দুটি পরিচিত ছিল জল্লাদখানা ও নূরী মসজিদ বধ্যভূমি হিসেবে। নূরী মসজিদ বধ্যভূমি থেকে উদ্ধারকৃত খুলি ও হাড়গোড়ের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল ছিন্ন জামাকাপড়, ওড়না-শাড়ি-ফ্রক, জুতা-স্যান্ডেল, মানিব্যাগ, তসবি ও ব্যক্তিগত ব্যবহৃত অনেক কিছু। এসবের কয়েকটি এ বধ্যভূমির সংগ্রহশালাতে প্রদর্শিত হচ্ছে। জল্লাদখানার পাম্প হাউজের কূপের সামনে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়েছিল অনেক বাঙালিকে। তারপর তাদের মরদেহ ফেলা হয় পানিভর্তি গহ্বরে। এলাকার বিভিন্ন জায়গায় শহীদদের লাশও টেনে ফেলা হয় এখানে।

মিরপুর দশ নম্বর গোল চত্বর পেরিয়ে বেনারসি পল্লী ধরে কিছুটা এগিয়ে যেতেই এ বধ্যভূমি। এর প্রবেশপথের ছোট্ট ফটকের গায়ে লেখা_ ‘কী বলতে চায় মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি, শুনতে কি পাও?’। এরপর ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রথমে নজরে আসে প্রায় চৌকোনা মাটির স্মারক। সবুজ বিস্তীর্ণ এ ঘাসের নিচে শায়িত রয়েছেন এক মা ও তার দুই সন্তান_ এমন ভাবনা থেকেই এটি তৈরি। ‘শূন্য হৃদয়’ নামে এ স্মারকটির স্থপতি কবি রবিউল হুসাইন। এর চারপাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে জানা গেল, সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৪৭৭টি বধ্যভূমির তালিকা। বিভাগওয়ারি করা এ তালিকার মাঝে কাচের ভেতরে মাটির পাত্রে রাখা আছে দেশের অন্যতম ছয়টি বধ্যভূমির মাটি। এসব বধ্যভূমি হলো_ কিশোরগঞ্জের বড়ইতলা, রাজশাহীর বাবলাবন, জয়পুরহাটের পাগলা দেওয়ান, চট্টগ্রামের ফয়’স লেক, যশোরের চুকনগর এবং সিলেটের আদিত্যপুর। প্রতিটি বিভাগের মাটির পৃথক রঙ মনে করিয়ে দেয় ষড়ঋতুর এ দেশের বৈচিত্র্যময়তা। এর মাঝ বরাবর দেয়ালে রয়েছে একটি ফলকচিত্র। শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুজ্জামানের যৌথ এ চিত্রের শিরোনাম ‘জীবন অবিনশ্বর’। যাতে তুলে ধরা হয়েছে, একাত্তরে মিরপুরের এই জায়গাটির গণহত্যার প্রতীকী দৃশ্য।

এসব দেখা শেষ হতেই ছোট্ট একটি ঘর নজরে আসে। এটিই সংগ্রহশালা। যার প্রবেশমুখে ঝুলছে একটি ঘণ্টা। এর নাম ‘সেন্টিমেন্ট বেল’। দর্শনার্থীকে এ ঘণ্টা বাজিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। এ শব্দ শহীদদের কাছে নিজের আগমনের বার্তা জানান দেয়। জুতা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেয়ালে দেখা মেলে মিরপুরে শহীদদের নামের একটি তালিকা। ইতিমধ্যেই সেখানে সন্নিবেশিত হয়েছে ৭০টি নাম। আরও নতুন নতুন নাম যুক্ত। এর পর দেখা মেলে সেই কুয়ার। হত্যার পর যেখানে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল শহীদদের। এর সামনে একটি কাচের সেলফের ভেতরে রয়েছে এখানকার বধ্যভূমির মাটি। আর তিনটি বক্সে রাখা হয়েছে শহীদ হওয়া মানুষগুলোর ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র। এ ছাড়াও এখানে তৈরি করা হয়েছে ‘স্মৃতি টাওয়ার’। মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পূর্তির এ স্মারকটি একজন তরুণের হাতে জাতীয় পতাকা দেখানো হয়েছে। এটির নির্মাতাও স্থপতি রবিউল হুসাইন।

বধ্যভূমির বৈঠকখানায় বসে কথা হলো স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদুজ্জামানের সঙ্গে। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি এই মিরপুরেই নিজের চোখের সামনে বিহারিদের হাতে প্রাণ হারাতে দেখেন বাবা আক্রব আলীকে। তিনি বললেন, ‘এখানে এলে এক ধরনের শান্তি আসে। মনে হয়, শহীদদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে এসেছি। নিয়মিতভাবেই এখানে আসি, সে সময়কার বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করি।’ আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ওফাজ উদ্দিন বললেন, ‘আমরা স্থানীয়রাই প্রথম এ বধ্যভূমির সন্ধান পাই। পরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এটাকে খনন ও সংরক্ষণ করছে। প্রতিদিনই এখানে আসি, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলি। এটাই আমাদের প্রাপ্তি।’

জল্লাদখানার বধ্যভূমির তত্ত্বাবধায়ক কে এম নাসিরউদ্দীন জানান, মিরপুরবাসীর তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ওয়াসার পরিত্যক্ত পাম্প হাউজে খননকাজ চালায়। এখান থেকে পাওয়া যায় ৭০টি মাথার খুলি, পাঁচ হাজার ৩৯২টি অস্থিখণ্ড ও শহীদের ব্যবহার্য নানা সামগ্রী। ২০০৭ সালের ২১ জুন মিরপুরের শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাত ধরে এই স্থাপনাটির দ্বার উন্মোচন করা হয়।

তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ জল্লাদখানা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না। একটি বাক্স আছে, যার যা ইচ্ছা, সে সেখানে দিয়ে যায়। প্রতিদিনই গড়ে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ দর্শনার্থী এখানে আসেন। উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত এ সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেছেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ।

Originally posted 2017-07-30 03:02:57.

Hasan

I Love likebd.com

1 comment

Categories

June 2020
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
June 2020
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930