শীতের উষ্ণতায়


.
বাড়িতে এসে জেরিনকে অনেকবার ডেকেও যখন পেলাম না, তখন মা বলল
-জেরিন ওর বাপের বাড়ি গিয়েছে।
-কখন গেল?
-দুপুরের দিকে। যাওয়ার আগে তোর কাছে ফোন করেছিল। তুই ধরলি না।
-আচ্ছা। আমি দেখছি।
-বাড়িতে এসে তো তোকে বাড়িতে পাওয়া যায় না। সবসময় ব্যাস্ত থাকিস।
-অনেকদিন পরে বাড়িতে এসেছি। তাই একটু ব্যাস্ততা আছেই।
-তুই খেতে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি।
-আচ্ছা।
.
হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে মাকে বললাম
-জেরিন ফিরবে কবে?
-যেইরকম কিছু বলে যায় নি। তবে তোকেও যেতে বলেছে।
-আমি যাব না।
-যাবি না কেন?
-শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কি হবে?
-তুই গিয়ে ঘুরে আসিস তবুও। তোর ছুটি আর কতদিন আছে?
-আর চার পাঁচদিন আছে।
-তোর যা ইচ্ছা কর।
.
খাওয়াদাওয়া সেরে নিজের রুমে শুয়ে পরলাম। বিয়ের আগে গ্রামে আসলে যেই রুমে থাকতাম, এখনও সেই রুমেই থাকি। আসলে ব্যাচেলর থেকে এখন বিবাহিত হয়েছি।
.
ঠান্ডা থাকায় লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। ফোনের দিকে তাকিয়ে সেখলাম সাতটা মিসডকল আর দুইটা মেসেজ। যেই মিসডকলগুলো সবই জেরিনের।
.
জেরিনের মেসেজ বের করে পড়তে থাকলাম। “গ্রামের বাড়িতে আসলে আমাদের বাড়িতে যাওয়া হয় না। মা অনেকদিন ধরেই বলছিল। কিন্তু যাওয়া হয় নি। এবারে তোমার অনেকদিন ছুটি থাকায় আমাদের বাড়িতে যাচ্ছি। তুমিও কালকে চলে এসো।”
.
মেসেজটা পরে মুচকি হেসে দিলাম। আমি তো জেরিনের কাছে কোন কৈফিয়ত চাই নি। তার আগেই সে মেসেজে অনেককিছু লিখে দিয়েছে। ভাবলাম ফোনে একবার কথা বলি।
.
জেরিন ফোন ধরে বলল
-বাড়িতে ফিরেছ নাকি?
-হ্যা। এখন বাড়িতেই আছি।
-সারাদিন কোথায় ছিলে?
-বন্ধুর সাথে শহরে গিয়েছিলাম। ওর একটা কাজ ছিল।
-কাজ হয়ে গেল?
-হ্যা। আপাতত সব কাজ শেষ।
-তাহলে কালকে আমাদের বাড়িতে চলে এসো।
-না। তুমিই ঘুরে চলে আসো। আমি আর যাব না।
.
জেরিন একটু চুপ হয়ে বলতে শুরু করলো
-মানুষ শ্বশুরবাড়িতে মনের আনন্দে আসে। আর তুমি আসতে চাইছ না কেন?
-ভাল লাগে না তাই।
-আচ্ছা। তোমার ভাল লাগার দরকার নেই। আমি নিজেই চলে আসবো।
.
জেরিনের সাথে কথা বলে ফোন কেটে বিছানার উপর রাখতেই জেরিনের ফোন পেলাম।
.
ফোন রিসিভ করে বললাম
-বলো।
-তুমি ফোন কাটলে কেন?
-আমি ভাবলাম কথা বলা শেষ। তাই ফোন কেটে দিয়েছি।
-আমি কি বলেছি আমার কথা শেষ!!
-না বলো নি।
-তবে ফোন রাখলে কেন?
-আচ্ছা ভুল হয়েছে। বলো কি বলবে।
-খাওয়াদাওয়া করেছ?
-হুম। তুমি বাপের বাড়িতে গিয়েছে শান্তিতে থাকার জন্য। বারবার আমাকে ফোন দিচ্ছ কেন?
-আমি যেখানেই যাই। তোমার চিন্তা সবসময় আমার মাথায় থাকেই।
-আর কথা বলতে হবে না। এখন ঘুমাবব।
-আচ্ছা ঘুমাও।
.

.
আজ তিনদিন হল জেরিন আমার কাছে নেই। একটু একটু তাকে মিস করতে শুরু করে দিয়েছি। প্রথম প্রথম ব্যাচেলরের মত শান্তিতে থাকলেও এখন একটু অশান্তি লাগছে।
.
রাতে বাড়িতে এসে খেতে বসেছি। খেতে বসে জেরিনের ফোন বাজছে। কিন্তু আমি রিসিভ করছি না। আমার মত আমি খেয়ে যাচ্ছি।
.
কয়েকবার ফোন বাজার পরে মা বলল
-কিরে কার ফোন? রিসিভ কর।
-জেরিনের ফোন।
-তো রিসিভ কর।
-তুমি কথা বলো তাহলে।
.
ফোন রিসিভ করে মায়ের কাছে দিলাম, মা জেরিনের সাথে কথা বলছে। ওপাশ থেকে কিছু শুনছি না, তবে এপাশ থেকে মায়ের কথা শুনছি।
.
কথা বলা শেষে মা বলল
-কিরে জেরিন নাকি তোকে যেতে বলেছে?
-হ্যা বলছে।
-যাস নি কেন?
-ধুর। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কি হবে।
-তোর বাবার মত তোরও শ্বশুরবাড়ির প্রতি এলার্জি কেন বলতো।
-বাবার রক্ত তো আমার মধ্যে আছে।
-শোন। তোর এত কথা শুনতে চাই না। তুই হোন্ডা নিয়ে বউমাকে নিয়ে আয়।
-আচ্ছা খেয়ে যাচ্ছি।
-খেতে হবে না। ওখানে গিয়ে পিঠা খেয়ে আসবি। তোর জন্য পিঠা বানিয়েছে।
-আচ্ছা। ঠিকাছে।
.
হোন্ডা নিয়েই বেড়িয়ে পরলাম। ঘড়িতে তখন রাত আটটার মত বাজে। হোন্ডা চালিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া খারাপ না।
.
গিয়ে দেখলাম জেরিন বসে আছে। জেরিন আমাকে দেখেই বলল
-এতক্ষণ লাগে তোমার আসতে?
-এত পথ আসতে সময় লাগবেই তো।
-রাস্তায় তোমার সময় লাগে নি। যা সময় বাড়িতেই লেগেছে।
-অত কথা না বলে যা করার তাই করো।
.
শ্বশুরবাড়ির পিঠা আয়েশ করেই খাওয়া যায়। তাই তেমন আয়েশ করেই খাচ্ছি। ছোট শালি এসে বলল
-দুলাভাই আপনি আমাদের ভুলেই গিয়েছেন।
-নারে ভাই ভুলিনি। সময়ের অভাবে আসা হয় না।
-আজকে কিন্তু থাকতে হবে। আপনাকে যেতে দেওয়া হবে না।
-আমাকে চলে যেতে হবে।
-দাঁড়ান। আমি আপুকে ডেকে আনছি।
.
জেরিন এসে বলল
-তুমি নাকি চলে যেতে চাচ্ছ?
-তো থেকে কি করব?
-শ্বশুরবাড়ি এসে মানুষ অন্তত একদিন তো থাকে।
-আমি থাকব না।
-তাহলে কিন্তু আমিও যাবো না। এবারে তুমি চিন্তা করো যাবে নাকি থাকবে?
-আচ্ছা দেখি।
.
উপায় না দেখে শ্বশুরবাড়িতেই থেকে গেলাম। ঠান্ডার মধ্যে লেপ গায়ে শুয়ে আছি। জেরিনও এসে পাশে শুয়ে পরলো।
.
ঠান্ডায় চুপচাপ শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ জেরিন বলল
-এই ওঠো।
-কি হয়েছে?
-আমি এখানে আসার পরে তো একদিনও গোসল করো নি মনেহয়। এখন গোসল করবে চলো।
-এত রাতে!!!
-বেশি রাত হয় নি, এখন নয়টা বাজে।
.
কয়েকদিন গোসল না করায় কেমন যেন লাগছিল। জেরিন গরম পানি গরম করে দেওয়ায় গোসল করেই ফেললাম। এখন অবশ্য একটু ফ্রেশ লাগছে।
.
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে লেপের নিচে শুয়ে পরলাম। জেরিন বলল
-এদিকে সরে আসো।
-কেন?
-তাহলে ঠান্ডা লাগবে না।
-আচ্ছা।
.
লেপের নিচে শুয়ে এখন আর ঠান্ডা লাগছে না। দুজনের শরিরের উষ্ণতায় ঠান্ডা কমে গিয়েছে। আমি শুধু তাকিয়ে আছি ওই মুখের দিকে। শীতের উষ্ণতায় জেরিনের মুখের হাসি দেখতে খুব ভাল লাগছে।
.
ওই মুখের হাসি দেখে কতসময় পার করে দিতে পারব জানি না। তবে হাসি দেখার জন্য অনেককিছুই করতে পারি। ওই হাসি দেখে কবিতা লিখে ফেলতে পারি,শীতের উষ্ণতায় হারিয়ে যেতে পারি তাকে নিয়ে।
.
— Jubaer Hasan Rabby

Originally posted 2016-01-14 15:11:46.

About the Author

Hasan
I Love likebd.com

1 Comment on "শীতের উষ্ণতায়"

  1. গল্পটা অনেক ভালো লাগল ভাই।

Leave a comment

Skip to toolbar