Likebd.com
‘পুলিশের সাথে কারো বন্ধুত্ব হয় না- মানুষ যথার্থই বলে’

‘পুলিশের সাথে কারো বন্ধুত্ব হয় না- মানুষ যথার্থই বলে’

মনিরুল ইসলাম: মেয়ের বিয়ে। দম ফেলার ফুরসত নাই। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। নানারকম যোগাড়-যন্ত্র নিয়ে ছালাম সাহেব ব্যস্ত। বিয়ের সাত দিন বাকী। ছেলেটি আমেরিকা থেকে ফ্লাই করেছে। ঢাকায় এলে তাকে কাজে লাগানো যাবে। ক’দিন তিনি ব্যবসার কাজে ও সময় দিতে পারছেন না। কিছু কিছু মানুষকে নিজে গিয়ে দাওয়াত দিতে হয়। রাস্তায় ট্রাফিকের খারাপ অবস্থা। […]

মনিরুল ইসলাম: মেয়ের বিয়ে। দম ফেলার ফুরসত নাই। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। নানারকম যোগাড়-যন্ত্র নিয়ে ছালাম সাহেব ব্যস্ত। বিয়ের সাত দিন বাকী। ছেলেটি আমেরিকা থেকে ফ্লাই করেছে। ঢাকায় এলে তাকে কাজে লাগানো যাবে। ক’দিন তিনি ব্যবসার কাজে ও সময় দিতে পারছেন না। কিছু কিছু মানুষকে নিজে গিয়ে দাওয়াত দিতে হয়। রাস্তায় ট্রাফিকের খারাপ অবস্থা। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির প্রতিযোগিতা চলছে। ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় কেটে যায়। টেবিলে নাস্তা দেওয়া হয়েছে।

আজ গন্তব্য সচিবালয়। কয়েকজন মন্ত্রীকে দাওয়াত দেবেন। মেয়েটা ক্লাশে গেছে। স্ত্রী মারা গেছে পাঁচ বছর। ছেলেমেয়ের কথা চিন্তা করে ছালাম সাহেব আর বিয়ের কথা ভাবেন নি। দু’বছর হলো ছেলেটা নিউইয়র্কে। এত বড় বাড়িতে দু’জন মাত্র মানুষ। মেয়েটাকে তিনি বড় ভালোবাসেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে-ই তার একমাত্র বন্ধু। বড়ঘরে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। আয়োজনে কোনরকম ঘাটতি রাখতে চান না। টাকার চিন্তা নাই। আল্লাহ তাকে যথেষ্ট দিয়েছে। ছালাম সাহেব নাস্তার টেবিলে। পাউরুটিতে জেলি মাখাচ্ছেন।

ফোন বেঝে ওঠে। স্ক্রীনে অপরিচিত নম্বর দেখে ইতস্ততঃ করেন। জরুরী ফোন ও হতে পারে। তিনি ফোন ধরেন। ছালাম সাহেব, ‘ওয়ালাইকুম আচ্ছালাম’ বলে জবাব দেন। ওপাশের প্রশ্নের জবাবে তিনিই আবদুছ ছালাম স্বীকার করেন। ছালাম সাহেব ওপাশে কে তা বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি কন্ঠের মিল খোঁজার চেষ্টা করেন। না মিলছে না, পরিচিত কেউ না। অভ্যাসবশতঃ পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। পরিচয় না দিয়ে ‘বসের সাথে কথা বলেন’ বলে আরেকজনকে ফোন দিয়ে দেয়। এবার গুরুগম্ভীর কন্ঠ ওপাশে-‘আমি সুব্রত বাইন বলছি’। কোন সুব্রত বাইন জানতে চাইলে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন বলে পরিচয় দেয়। ছালাম সাহেব এক মূহূর্ত চিন্তা করেন। বুঝতে চান সুব্রত বাইনের সাথে তার কোন কাজ থাকতে পারে কিনা।

‘আমার কাছে কি চান?’- ছালাম সাহেব জানতে চান। সুব্রত বাইন নিজেই বলতে থাকে। তার দলের ছেলেদের সাথে পুলিশের গোলাগুলি হয়েছে। চারটা ছেলে গুরুতর আহত। তিনজন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। পাঁচটা অস্ত্র হাতছাড়া হয়ে গেছে। সুব্রত বাইনের এখন অনেক টাকা দরকার। আহত ছেলেদের চিকিৎসা করাতে হবে। যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের জামিন করাতে হবে। উকিলের সাথে ৪০ লাখ টাকার কন্ট্রাক্ট হয়েছে। অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে তাই টাকার অংক বেড়েছে। নতুন করে অস্ত্র কিনতে হবে। বিদেশী অস্ত্র। তাতেও অনেক টাকা লাগবে। আহতদের বিদেশে নিতে হবে। অনেক খরচ। সুব্রত বাইন এককোটি টাকার হিসেব দেয়। কিন্তু সুব্রত বাইন বিবেকহীন নয়। ছালাম সাহেবের মেয়ের বিয়েতে অনেক খরচ হবে। সুব্রত বাইন তাই বিবেচনা করে ছালাম সাহেবের কাছে মাত্র পঞ্চাশ লাখ টাকা সাহায্য চায়। সুব্রত বাইন সন্ত্রাসী হলেও ছালাম সাহেবের সাথে খুব ভদ্র ব্যবহার করছেন।

ছালাম সাহেব বড় ব্যবসায়ী। জীবনে অনেকবারই অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েছেন। পুলিশের হর্তাকর্তাদের সাথে তার সুসম্পর্ক। ফলে কখনোই ঘাবড়ান নাই। এবার ও বিচলিত হন না। তিনি কেন টাকা দেবেন বলতেই সুব্রত বাইনের সূর কিছুটা চড়া। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “আপনার মেয়েতো নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। বিবিএ শেষ করেছে। এমবিএতে ক্লাশ করছে। নয়টার দিকে ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে ক্লাশে যায়। ফিরতে ৩/৪ টা বেজে যায়। ছেলেকেতো আমেরিকায় পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে ও তো দেশে আসছে। চুপচাপ করে টাকা দিয়ে দেন, আপনারই ভালো হবে। না’হলে আপনার মেয়ে বাসায় না এসে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যাবে। এসিড চেনেন তো। আপনার ছেলেকে কেটে সাত টুকরো করবো। ভয় নেই আমাদের ও বিবেক আছে। এক টুকরো আপনাকেও পাঠিয়ে দেবো।”

ছালাম সাহেবের সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে। তিনি ঘাবড়ে যান। তাঁর সমস্ত তথ্যই সুব্রত বাইন জানে। সুব্রত বাইন ফোন কেটে দেয়। ছালাম সাহেব নির্বাক হয়ে যান। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার কিছু হলে মেনে নেবেন। কিন্তু তার আদরের ছেলে মেয়ে। না, তাদের কোন ক্ষতি তিনি ভাবতেই পারেন না। তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তিনি দিয়ে দিতে পারেন তবুও ওদের কোন ক্ষতি মেনে নেবেন না। টলতে টলতে তিনি ড্রইংরুমে যান। ধপাস করে সোফায় বসে পড়েন। তার মনে হয় এই কয় মিনিটে তার বয়স বিশ বছর বেড়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। কলিং বেল চেপে পানি চেয়ে নেন। বারবার মেয়ের মুখ চোখের সামনে ভাসছে। সেদিন ট্রাফিক সিগন্যালে একটা ভিক্ষুক পয়সা চেয়েছিল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার গা গুলিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটার সমস্ত মুখমন্ডল এসিডে পুড়ে বিকৃত। এখন আবার ঐ মেয়েটার বিকৃত মুখ চোখের সামনে দেখতে পান। হঠাৎ মনে হয় তিনি মেয়ের খবর নিচ্ছেন না কেন। মেয়ের ফোন অনেকক্ষন ধরে রিং হতে থাকে। ওপাশ থেকে সাড়াশব্দ নাই। ছালাম সাহেব বড় বিপন্ন বোধ করতে থাকেন।

আবার সুব্রত বাইনের ফোন। কাঁপা গলায় ছালাম সাহেব হ্যালো বলেন। সুব্রত বাইন তার মতামত জানতে চায়। তার সাঙ্গপাঙ্গরা তার বাসার সামনে অবস্থান করছে-সুব্রত বাইন তাও জানিয়ে দেয়। ছালাম সাহেব ততক্ষনে মনস্থির করে ফেলেছেন। পঞ্চাশ লাখ কোন টাকাই নয় তার কাছে। তিনি টাকাটা দিয়ে দেবেন। ওপাশে সুব্রত বাইনের অধৈর্য কন্ঠ। কি মনে করে সুব্রত বাইন কিছুটা ডিসকাউন্ট দিতে চায়। পঞ্চাশ নয় চল্লিশ লাখ টাকা দিলেই হবে। ছালাম সাহেব মনে মনে সুব্রত বাইনের তারিফ করেন। লোকটা ততটা খারাপ নয়। তিনি তো পুরোটাই দিয়ে দেবেন। সুব্রত বাইন কিভাবে টাকাটা নেবে তা জানাতে আবার ফোন দেবে বলে ফোন ছেড়ে দেয়। আবার রিং হয়, ছালাম সাহেব ফোন ধরেন। মেয়ে ক্লাশ করছে। নিরাপদেই আছে। ছালাম সাহেব নিজের গাড়ি পাঠাবেন। ছালাম সাহেব কোন ঝুঁকি নিতে চান না। তার গাড়িতে দু’জন আর্মড গার্ড থাকে। তারা নিরাপত্তা দিয়ে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসবে। ছালাম সাহেব মনে মনে কিছুটা স্বস্তিবোধ করেন। তিনি আজ আর সচিবালয়ে যাবেন না।

আরেকটি ফোন আসে। ছালাম সাহেবের বন্ধু, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর মিটিং পড়েছে, ছালাম সাহেবের সাথে আজ দেখা হবে না বলার জন্যই ফোন করেছেন। কি ভেবে ছালাম সাহেব তাকে সুব্রত বাইনের কথা খুলে বলেন। সব শুনে তিনি ছালাম সাহেবকে না ঘাবড়ানোর পরামর্শ দেন। ছালাম সাহেবকে তিনি সরাসরি তার অফিসে আসতে বলেন। রাস্তা কিছুটা ফাঁকা। কিছুক্ষনের মধ্যেই ছালাম সাহেব বন্ধুর অফিসে পৌঁছে যান। ডিআইজি সাহেব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তার কক্ষে ডাকেন। তারা এই ধরনের কমপ্লেন প্রায়ই পান। পুরোটাই প্রতারক চক্রের কাজ। ছালাম সাহেব কনভিনসড হন না। তার ছেলেমেয়ের পুরো ডিটেইল্স কোথায় পেলো। যৌক্তিক প্রশ্ন। এত খুঁটিনাঁটি তথ্য সুব্রত বাইন কোথায় পেলো।

পুলিশের সাথে কারো বন্ধুত্ব হয় না- মানুষ বোধহয় যথার্থই বলে। ছালাম সাহেবের মনে হয় তিনি পুলিশকে বিপদের কথা জানিয়ে ফেঁসে গেছেন…….

দ্বিতীয় পর্ব…..
ছালাম সাহেব তিনজন লোককে সন্দেহ করছেন। তাদের মধ্যে কেউ একজন সুব্রত বাইনকে তথ্য দিয়েছে। প্রথম সন্দেহ খালেকের উপর। খালেক তার গাড়ির ড্রাইভার ছিলো। গাড়ি ভালোই চালাতো। আচার-ব্যবহার ভাল ছিল। একটাই তার দোষ ছিল। নেশা করতো। ছয়মাস হলো খালেককে চাকুরীচ্যূত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন এখানে কাজ করেছে। পরিবারের সব খুঁটিনাটি বিষয় তার নখদর্পনে। খালেকের বাড়ী বরিশাল অঞ্চলে। সুব্রত বাইন ও নাকি ঐ এলাকার।

ছালাম সাহেব খালেকের অনেক উপকার করেছেন। খালেকের একমাত্র ছেলে দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ছিল। ছালাম সাহেব তাকে চেন্নাইতে পাঠিয়ে চিকিৎসা করিয়েছে। ১০/১২ লাখ টাকা খরচ করেছেন। খালেক সবসময়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এমনকি শেষদিন বাড়ী ছেড়ে যাওয়ার আগে ছালাম সাহেবের পা ধরে তার উপকারের কথা জানিয়েছে। খালেক সুব্রত বাইনকে খবর দিতে পারে। ছালাম সাহেব নিশ্চিত হতে পারছেন না।

তরুন কর্মকর্তার প্রশ্নে ছালাম সাহেব জানান তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না। মেয়েকে ফোন করে তার ফেসবুক আইডি জানতে চাইলে মেয়ে খুব অবাক হয়। ছালাম সাহেবের সাথে কখনো ফেসবুক নিয়ে কথা হয়নি। মেয়ে কারন জানতে চাইলে ছালাম সাহেব বাসায় এসে খুলে বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফোন ছেড়ে দেন।

তরুন পুলিশ কর্মকর্তা মেয়ের টাইমলাইন পর্যালাচনা করেন। ছালাম সাহেবের মেয়ের কোন ব্যক্তিগত তথ্য ফেসবুকে নাই। ফেসবুক থেকে সুব্রত বাইনের তথ্য পাওয়ার কোন সুযোগ নাই। তরুন কর্মকর্তার অনুরোধে ছালাম সাহেব ছেলের কাছ থেকে জানতে পারেন ব্যস্ততার কারনে ৬/৭ মাস আগে তার আইডি ডিএ্যাকটিভ করেছে। সেখান থেকেও সুব্রত বাইন তথ্য পায় নাই।

ছালাম সাহেবের কর্পোরেট অফিসের অ্যাকাউন্ট সেকশনের দু’জন এমপ্লয়ীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। ছালাম সাহেবের ছেলেমেয়ে দু’জনই কোম্পানীর পরিচালক। পরিচালকদের সকল তথ্য অফিসে সংরক্ষিত আছে। দীর্ঘদিন চাকুরী করার সুবাদে চাকুরীচ্যূত দু’জনও তার পরিবারের তথ্য জানে। তারাও সুব্রত বাইনকে তথ্য দিতে পারে। আসামী ধরা পড়লে তাকে জানানো হবে বলে ডিআইজি সাহেব তাকে বাসায় যেতে বলেন।

ছালাম সাহেব হতাশ হন। তার মনে হয় ডিআইজি সাহেব বিষয়টার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না। নাকি বুঝেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ছালাম সাহেব দ্বন্দ্বে পড়ে যান। তিনি ডিআইজি সাহেবকে বলে কি ভুল করলেন। তার তো জীবন মরণ সমস্যা।

ডিআইজি সাহেব তার বিষয়টি হাল্কাভাবে নিয়েছেন। ছালাম সাহেব আপসোস করেন। চা আসে। ছালাম সাহেব দ্রুত চা খান। তিনি যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে বের হতে পারেন ততই মঙ্গল। একটাই স্বস্তি মেয়েটা বাসায়। নিরাপদে আছে। ছেলে তো ফ্লাইটে আছে। সেও নিরাপদে। ডিআইজি সাহেব ছালাম সাহেবকে এ নিয়ে দূঃশ্চিন্তা করতে না করেন।

ডিআইজি সাহেব নিজে লোক-লস্কর নিয়ে চলাফেরা করেন। তাছাড়া একমাত্র মেয়ে কানাডায় আছে। তারতো কোন চিন্তা নাই। ছালাম সাহেবের দুঃখ তিনি কি করে বুঝবেন। এতো দিনের পুরোনো বন্ধু অথচ আজ ছালাম সাহেবের বিপদটাকে তিনি আমলেই নিচ্ছেন না। পুলিশের সাথে কারো বন্ধুত্ব হয় না-মানুষ বোধহয় যথার্থই বলে।

ছালাম সাহেব মনে মনে ভাবে পুলিশকে বিপদের কথা জানিয়ে তিনি ফেঁসে গেছেন। সুব্রত বাইন তাকে বারবার সতর্ক করেছেন। পুলিশকে জানালে বিপদ বাড়বে। পুলিশের কর্তারাও নাকি তাকে ট্যাক্স দিয়ে চলে। পুলিশ তার কিছুই করতে পারবে না। যদি সুব্রত বাইন পুলিশের খবরটা জেনে যান তিনি বিপদে পড়ে যাবেন। কেন যে তিনি ডিআইজি সাহেবকে বিষয়টা জানাতে গেলেন। তিনি একটা বড় রকম ভুল করে ফেলেছেন। ছালাম সাহেব অন্যমনস্ক হয়ে যান।

বাসায় ফিরে ছালাম সাহেব অসুস্থ বোধ করেন। ব্লাড প্রেসারটা বেড়েছে। ডিআইজি সাহেবের পরামর্শে তিনি মোবাইল বন্ধ রেখেছেন। অনেকক্ষন তিনি মেয়ের হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকেন। মেয়ে কিছুটা অবাক হয়। ক’দিন বাদে বিয়ে তাই হয়তো বাবার মন খারাপ। ডিআইজি সাহেবের সাথে মাঝে একবার কথা হয়। সুব্রত বাইনের কল লোকেশন নাকি মাদারীপুর। এ খবর শুনে ছালাম সাহেবের কি লাভ।

সুব্রত বাইন যেখানেই থাকুক তার লোকজন তো ঢাকায় আছে। ছালাম সাহেবের বাসার সামনেও থাকতে পারে। তিনি চোখের সামনে এসিডে বিকৃত ভিখারীর মুখটা দেখতে পান। তিনি পুনরায় সিদ্ধান্ত নেন সুব্রত বাইনকে টাকাটা দেবেন। ডিআইজি সাহেবকে কিছু জানাবেন না। ফোন অন করে সুব্রত বাইনের নম্বরে কল করেন। না, সুইচ অফ। সুব্রত বাইন কি তা’হলে সব জেনে গেছে? ছালাম সাহেব নতুন করে আতঙ্কিত হন। রাতে ছালাম সাহেব ঘুমাতে পারেন না। পরেরদিন মেয়েকে ইউনিভার্সিটি যেতে দেন না। সাত সকালে ছেলে বিমান থেকে নেমে ছালাম সাহেবকে এয়ারপোর্টে দেখে অবাক হয়। বাবাতো তাকে এয়ারপোর্টে সিঅফ কিংবা রিসিভ করে না। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। ছেলে বাবার আচরণ কিছুতেই বুঝে ওঠে না। গাড়িতে বাবা অন্যমনস্ক। বোনের বিয়ের প্রসঙ্গে ছেলের নানা প্রশ্নের জবাবে ছালাম সাহেব টুকটাক কথা বলেন। ছেলে বুঝতে পারে বাবা কোন কথা বলতে চাচ্ছেন না।

বাসায় ফিরে ছালাম সাহেব ফোন অন করে আবারও সুব্রত বাইনের নম্বরে ডায়াল করেন। মোবাইল যথারীতি বন্ধ। ডিআইজি সাহেব নাকি সুব্রত বাইনকে ধরে ফেলবেন। ছালাম সাহেব পুরোপুরি বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। বিকালে নিজেই ডিআইজি সাহেবকে ফোন করেন। ডিআইজি সাহেব এবারো আশ্বাস দেন। কিন্তু কবে ধরা পড়বে। ধরা পড়ার আগেই যদি তার ছেলে কিংবা মেয়ের কোন ক্ষতি করে ফেলে।

পরের দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি। মেয়ের ভার্সিটি বন্ধ। মেয়েকে তিনি বাসা থেকে বের হতে দেবেন না। কিন্তু ছেলেকে কি বলে আটকাবেন। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে ছেলের সাথে নিজের বডিগার্ড দেন। ছেলের আপত্তি আমলে নেন না। তবু প্রতিটা মুহূর্ত তিনি আতঙ্কে কাটাচ্ছেন। দু’দিন পর ফোন অন করতেই কল আসে। সুব্রত বাইন।

সুব্রত বাইন এবার সরাসরি চার্জ করে। নানা হুমকি দিতে থাকে। কেন ছালাম সাহেব থানায় গিয়েছিল কৈফিয়ত চায়। ছালাম সাহেব বুঝাতে চেষ্টা করে তিনি থানায় যান নাই। সুব্রত বাইনের কন্ঠ চড়া হতে থাকে। টাকার অঙ্ক দশ লাখ বাড়িয়ে দেয়। পঞ্চাশ লাখ টাকাই দিতে হবে। অতিরিক্ত দশলাখ জরিমানা। থানার ওসি তার পকেটে থাকে সুব্রত বাইন তাও জানিয়ে দেয়। কিন্তু ছালাম সাহেব তো থানায় যায়নি। এই প্রথম তার খটকা লাগে। তিনি দোতলার জানার কাছে এসে বাইরে তাকান। সামনের রাস্তায় কাউকে দেখা যায় না। দূরে একটা পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে।

সুব্রত বাইন জানালো বাসার গেটের সামনে তার ছেলেরা পাহারা দিচ্ছে। ছালাম সাহেব ভাবেন হয়তো আড়ালে কোথাও আছে। কোন রিস্ক নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তিনি টাকাটা দেবেন। পঞ্চাশ লাখই দেবেন। সুব্রত বাইন একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কথা বলেছে। কোন শাখায় কার নামে টাকা দিতে হবে তাও বলে দিয়েছে। থানার সাথে যোগাযোগ করলে সে চরম প্রতিশোধ নেবে তাও জানিয়ে দিয়েছে। সুব্রত বাইনের ফোন রাখার দশ মিনিটের মাথায় ডিআইজি সাহেবের ফোন আসে। তিনি ছালাম সাহেবকে সরাসরি টাকার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি সুব্রত বাইনকে টাকা দিতে নিষেধ করেন। ছালাম সাহেব রেগে যান। সুব্রত বাইনের কিছু করতে পারছে না অথচ তার ফোনে পুলিশ আঁড়ি পেতেছে। পুলিশকে সরাসরি গালিও দেওয়া যায় না। জীবনে তিনি আর পুলিশের সাথে যোগাযোগ রাখবেন না।

পরের দিন ডিআইজি সাহেব ফোন দেন। ছালাম সাহেবকে ফোন খোলা রাখতে বলেন। সুব্রত বাইনের ফোন আসে। ডিআইজি সাহেবের পরামর্শ মতো তিনি নির্ধারিত অ্যাড্রেসে পাঁচ লাখ টাকা পাঠান। সুব্রত বাইন টাকা পাঠানো হয়েছে শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হয়। সন্ধ্যার আগেই বাকী টাকা পাঠানোর তাগাদা দিয়ে সে ফোন কেটে দেয়। ডিআইজি সাহেবের পরামর্শমতে ছালাম সাহেব ফোন বন্ধ রাখেন। দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে ছালাম সাহেবের রাত কাটে।

সকালে নাস্তার টেবিলে বসে ডিআইজি সাহেবের ফোন পান। চার সহযোগী সহ সুব্রত বাইন ধরা পড়েছে। কুরিয়ার সার্ভিস থেকে টাকা নিতে আসা লোকটা প্রথম ধরা পড়ে। যে নম্বর থেকে ফোন করেছে সেই ফোনসহই গ্রেফতার হয়েছে। ডিআইজি সাহেবের অনুরোধে ছালাম সাহেব তার অফিসে যান। রোগা চেহারার একজন লোককে সামনে আনা হয়। বয়স পঞ্চাশের উপর। এই নাকি সুব্রত বাইন….(চলবে)!

লেখক: পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান। (ফেসবুক থেকে নেয়া)

Add comment

Most discussed